TahMiD's Blog! Tech, Science Writer & Blogger

২০১৯ সালের কচিকাঁচা Vs ২০০৫ সালের আমি!

একটু জেচে ভেবে দেখার জন্য এই পোস্ট! দেখি আজকের তুলনায় প্রায় ১৪ বছর পূর্বে আমি কেমন জীবন যাপন করেছি। শুরুতেই বলে রাখছি আমি গ্রামে মানুষ হওয়া ছেলে, এখনো সময় পেলে এবং সম্ভব হলে গ্রামেই বেশিরভাগ সময় কাটায়। গ্রামের মানুষ গুলোর কূটনৈতিক আচরণ বাদে গ্রামের কোন কিছুই তেমন অপছন্দের নয় আমার কাছে।

স্কুলের শুরু

একেবারে যদি যদি শুরু থেকে শুরু করি, আমি বাপ মায়ের অনেক আদরের ছেলে ছিলাম সেসময় আবার একই সাথে একটু কড়া শাসনেও থাকতাম। ক্লাস ১-৫ পর্যন্ত ব্র্যাক স্কুলে পড়েছি, যদিও গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় বা মাদ্রাসাও অপশন ছিল। আসলে আমার বড় মা ব্র্যাক স্কুলে চাকুরী করতো, তাই সেই রেফারেন্সেই সেখানে পড়াশুনা শুরু হয় আমার।

এখনকার পিচ্চি পোলাপাইন অবশ্যই অবশ্যই শহরের কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়ে, কেউ তো আবার ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশুনা করে। তবে মাঝেমাঝে এইটাই ভাবি, আসলে পড়ছে কে? ছাত্র নাকি ছাত্রের মা? ছেলেকে স্কুলে রেখে মায়েদের এক গুলতানি মারার ভালোই কায়েদা পেয়েছে কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়া ছেলে মেয়েদের মায়েরা! আমার সময়ে আমার মাকে আমায় স্কুলে নিয়ে যেতে হয়নি, আমি বড় মায়ের সাথেই একা পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতাম। মা সংসারের কাজ করতো বাড়িতে। গ্রামের পিচ্চিদের মায়েদের অনেক কাজ, বসে থাকলে তো আর আমার বাপে ভাত দেবে না!

২০০৫ সালে প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হতেই হলো আবার। মানে ক্লাস ৫ এ দুই বচ্ছর! আমার ফুফুর ইচ্ছা বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করতে হবে। অথচ আমার ক্লাসমেট গুলো হাই স্কুলে ভর্তি হয়ে গেলো সকলে রীতিমতো। আমার অবশ্যই তেমন খারাপ লাগেনি, কেননা আমার বয়সে ৩-৪ বছরের বড় গুলো তখনও আমার দুই এক ক্লাস নিচেই পড়াশুনা করে। তবে এখনকার পিচ্চি হলে মনে হয় অপমানের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে কি করতো কে জানে।

পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার পরেও হাতে গোনা কয়েকটা পুস্তক পড়তে হতো, আর আজকের বাচ্চাদের? হায় রে হায় আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেও যতো বই বহন করিনি, বেচারা বাচ্চাদের সেগুলো কাঁধে করে বহন করতে হয়। মাঝে মাঝে আমার ক্লাস ২ এ পড়া ভাতিজাকে দেখে খুব মায়া হয়। বইয়ের বোঝায় বেচারা লকলকে বাঁশের মতো বেঁকে যায়। আমি একবার ওজন পরীক্ষা করে দেখে মাথায় নষ্ট, বাফরে নিয়মিত ভাতিজাকে স্কুলে দিয়ে আসলে ভালো মাসলস তৈরি হয়ে যাবে, তাও বিনা ডাম্বেলে!

অবসর সময়

আমার অবসর সময় বলে কিছু ছিল না, আমি এতোটা দুরন্ত ছিলাম আর এতো ছুঁটে বেড়াতাম অবসর আবার কিসের? সকালে উঠে স্কুলে চলে যেতাম, মানে স্কুল ফাকি মারা কি জিনিষ সত্যিই জানতাম না সেসময়। মাঝে মাঝে শুক্রবারও স্কুলে চলে যেতে চাইতাম ভুল করে। জানি না এখনকার বাচ্চারাও কি সমানভাবে স্কুলকে এতোটা টানে কিনা। তবে যতোটা পড়ার চাপ, অনেকটা ব্যাস্তবতা অনুমান করতে পারছি। এরা হয়তো সপ্তাহে সাতদিনই শুক্রবার কামনা করে। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, শুক্রবার সকালেও স্কুল চলে গেছি দুই একবার, তারপরে ১-২ ঘণ্টা পরে মনে হয়েছে আজ তো ছুটি!

ডানপিঠে হওয়ার কারণে মায়ের সাথে খুব পিটন খেয়েছি। আর মুখ একেবারে পাশ করা ছিল আমার, খুব খারাপ কথা বলতাম, একটু কেউ লাগলেই আমার সাথে আমি ঝারা শুরু করে দিতাম। তবে বর্তমানে অনেক পিচ্চিরা যে সেকশনে গালি দেয় সেগুলো এখনো পাশ করতে পারি নাই। যদি অবসর এর কথা বলতেই হয়, আমার কিছু কথা মনে পরে। বিশেষ করে, পড়ার বইয়ের মধ্যে গল্পের বই লুকিয়ে পড়ার ওস্তাদ ছিলাম আমি। পারার লাইব্রেরির একটাও কিশোর সিরিজ বই বাকি রাখিনি পড়তে। পকেট থেকে টাকা চুরি করে লাইব্রেরিতে সাবস্ক্রিপশন নিতাম। ২০ টাকায় পুরা বছর এর সাবস্ক্রিপশন, সাথে বাড়িতে বই নিয়ে যাওয়ার অনুমতি। আহ!!! কি যে মজা!! ক্লাসের বই একেবারেই ফালতু লাগতো, বিশেষ করে প্রাইমারী স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর বই। যখন ব্র্যাক স্কুলে পড়তাম রঙ্গিন বই পেতাম, আর পুরাতন বই বলে কোন জিনিষ ছিল না। বাট প্রাইমারীতে সাদাকালো বই তো একে তারপরে আবার পুরাতন বই, ধুর!

এই জন্যই লাইব্রেরি থেকে রঙ্গিন বই নিতাম আর পড়তাম। অনেক সময় অনেক বড় বইয়ের আগাগোড়া কিছুই বুঝতাম না বাট বইয়ের সুন্দর কভার দেখে বই বাড়িতে পড়তে নিয়ে আসতাম। তারপরে সেই ভিপিএন পন্থা, মানে আসল বই ভেতরে আর পড়ার বই বাইরে! আম্মাও খুশি, আমিও খুশি!!

এখন কথা বলি এখনকার পিচ্চিদের নিয়ে! ওরে বাফরে যতো পড়ার বই হয়ে গেছে এদের অন্য বই পড়ার শখ। বই বলতেই গায়ে জ্বর এতে কোন সন্দেহই নাই। এদের অবসর মানেই মোবাইল, ট্যাবলেট, আর টিভির কার্টুন চ্যানেল – যেখানে মটু পাতলু আর চিঙ্গাম স্যার। এরা খেলতেও পারে না তেমন, খেলার জায়গাই বা কই? তবে মোবাইলে গেম খেলতে একেবারে ওস্তাদের ওস্তাদ। আমার ভাতিজার মোবাইল গেম খেলা দেখলে মাথা আর কাজই করে না আমার। আমার সময়ে মোবাইল কেবল দুই একজনের বাড়িতে এসেছে। তাও আবার ক্লাস ৫ এ পড়তে মোবাইল বলে কোন জিনিষ রয়েছে প্রথম জানতে পারি।

একদিন কি হয়েছে শুনুন, পেইড ফোনের দোকান থেকে মোবাইল নিয়েছি, ৩টাকা মিনিট, মানে আমার একদিনের টিফিনের টাকা শেষ! তারপরে আজাইরা এক নাম্বার বানিয়ে ডায়াল করেছি, নাম্বার প্যাটার্ন কিভাবে বানলাম সে এক আলাদা কাহিনী। যাই হোক, কল রিং হচ্ছে, কানে ফোন ধরেছি কিন্তু রীতিমতো হাত পা কেপে হাঁটুতে হাঁটু ঠোকাঠুকি শুরু হয়ে গেছে। যেই বলেছে হ্যালো, অমনি ধপ করে ফোন কেটে দিয়ে তিন টাকা দোকানদারকে শোধ করে বাড়ির পথে রাস্তা মাপতে শুরু করে দিলাম। এই হচ্ছে আমার প্রথম ফোনে কথা বলার অভিজ্ঞতা!

আমি খুব খেলাধুলা করতাম, ক্রিকেট, ধরা গুডু, লুকাচুরি, চোর পুলিশ, টিপু আরো কতো কি! একদিন গ্রামের খেলা গুলোর বিস্তারিত পোস্ট লিখে জানাবো, আজ নয়। যাই হোক, ক্রিকেট খেলতাম, কিন্তু বল কি জানেন? ছোট তাল দিয়ে, বা পলিথিন এ খর ঢুকিয়ে দরি দিয়ে বেধে বল বানিয়ে। আর ব্যাট হচ্ছে তাল গাছের ডাল বা অনেক সময় চৌকি থেকে কাঠ খুলে নিয়ে গিয়ে!! হাহাহা!

স্বপ্ন

গ্রামের পিচ্চিদের স্বপ্ন নিয়ে আর কি বলবো? তারপরে আবার ২০০০ সালের দিকের বাংলাদেশ। গ্রামের রাস্তায় ট্রাক আস্ত দুই তিন মাসে একবার, সেটা দেখতেই পেছনে সবাই দৌড়। আমার তো ট্রাকের ড্রাইভারদের দেখে মাথায় নষ্ট হয়ে যেতো, “বাফরে কতো বড় গাড়ি চালায়, আমিও বড় হয়ে ট্রাকের ড্রাইভার হবো!!” ট্রাকের চাকায় যে ধুলো উড়ত গ্রামের কাঁচা রাস্তা থেকে, ওরে সে দৃশ্য উপভোগ করার মজায় আলাদা ছিল।

তবে বাপ মায়ের স্বপ্ন ছিল ডাক্তার বানাবে, আমিও লোকে জিজ্ঞাস করলে বলতাম বড় হয়ে ডাক্তার হবো! ছোট বেলায় একটা স্বপ্ন ছিল, আহরে, যদি আমার একটা সিডি প্লেয়ার থাকতো আমি কতো গান শুনতে পারতাম। এতো গান ভালবাসতাম বলে বুঝাতে পারবো না। এখনও কি একদিন ও চলে নাকি মিউজিক ছাড়া?

এখনকার পোলাপাইনদের তো অগুনতি স্বপ্ন। এইত ফেসবুকে দেখলাম এক সিক্স সেভেন এ পড়া ছেলে পোস্ট করেছে, “যাক… কয়েক দিনের মধ্যেই একটা গেমিং পিসি হচ্ছে” – এগুলো পোস্ট দেখতে মাথা কাজ করে না ভাই। বাপে একটা বলও কিনে দিত না ভালো করে, আর এরা গেমিং পিসি কেনে তাও আমার এতো ছোট বয়সে! ক্যামনে? এখনো জানিনা! এরা রোবট বোঝে, সায়েন্স বোঝে, মহাকাশ বোঝে, আরো যে কত্ত কি! আর আমি তখন সাইকেলের টায়ার নিয়ে খেলে বেড়াতাম!

আমি ক্লাস ৯/১০ এ পড়ার সময়ও বাপকে কম্পিউটার কিনে দেওয়ার কথা ভয়ে বলতে পারতাম না। কি করতাম জানেন? খাতায় কলম দিয়ে উইন্ডোজ ডেক্সটপ আঁকাতাম, তারপরে মনে মনে কাজ করতাম, আবার অনেক সময় উইন্ডো গুলো আঁকাতাম, কনটেক্সট মেন্যু কলমে আঁকিয়ে রিফ্রেশ ক্লিক করতাম। তখনকার এই না পাওয়ার অনুভূতি এখনকার পিচ্চিরা কখনোই ফিল করতে পারবে না।

এখন পিচ্চিরা ফেসবুক বোঝে, ইউটিউব বোঝে, এমনকি গ্রাফিক্স ও বুঝে। আমি তো আলিফ লায়েলার দৈত্য আকাশে উরা দেখেই মাথা নষ্ট করে ফেলতাম। এদের এখন লাইফ লাইলা দেখালে বলবে “এতো ফালতু গ্রাফিক্স? এর থেকে টম জেরির গ্রাফিক্স ভালো” – যা বাবা, ঠেলা সামলাও এবার!


না অনেক রাত হয়ে গেছে, এবার ঘুম দেই, অনেক লিখলাম। এক পোস্ট থেকেই সব জানতে চান নাকি? ধুর! আর নয়, আরেক পোস্টে লিখবো আবার। অনেক লেখার রয়েছে এখনো। অনেক কিছু…… (চলবে…)

লেখকের সম্পর্কে

Tahmid Borhan

ইন্টারনেটে অধিকাংশ রিডার আমাকে টেকব্লগার এবং একজন টেকগীক হিসেবেই চেনেন। এছাড়াও আমি ইউটিউবে ভিডিও আপলোড করে থাকি, নতুন নতুন জিনিষ শিখতে এবং এক্সপ্লোর করতে ভালোবাসি, প্রচণ্ড মুভি দেখি ও গান শুনি, বিজ্ঞান চর্চা করতে ভালোবাসি।

আমার জীবনের সবচাইতে বড় শিক্ষা, "আসলে আমরা কেউই কাউকে প্রকৃতপক্ষে চিনি না, হোক সেটা যতো কালেরই মেলামেশা, আর প্রকৃত ভালোবাসা হয়তো রয়েছে কিন্তু সেটা আমার জন্য নয়"

1 comment

TahMiD's Blog! Tech, Science Writer & Blogger

Tahmid Borhan

ইন্টারনেটে অধিকাংশ রিডার আমাকে টেকব্লগার এবং একজন টেকগীক হিসেবেই চেনেন। এছাড়াও আমি ইউটিউবে ভিডিও আপলোড করে থাকি, নতুন নতুন জিনিষ শিখতে এবং এক্সপ্লোর করতে ভালোবাসি, প্রচণ্ড মুভি দেখি ও গান শুনি, বিজ্ঞান চর্চা করতে ভালোবাসি।

আমার জীবনের সবচাইতে বড় শিক্ষা, "আসলে আমরা কেউই কাউকে প্রকৃতপক্ষে চিনি না, হোক সেটা যতো কালেরই মেলামেশা, আর প্রকৃত ভালোবাসা হয়তো রয়েছে কিন্তু সেটা আমার জন্য নয়"